রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গাড়িতে পেট্রলবোমা মেরে যাত্রী হত্যা মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জ শুনানির জন্য আগামী ৩০ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত।সূত্র আরও জানায়, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের অভিযোগে ২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাটি করা হয়। ২০১৫ সালে রাজধানীর দারুসসালাম থানায় নাশকতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা হয়। যাত্রাবাড়ীতে যাত্রী হত্যা মামলাটিসহ অপর মামলাগুলো ২০১৫ সালে দায়ের করা হয়। পরের বছরের বিভিন্ন সময় এসব মামলায় আদালতে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়।
গত বছরের ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় কাকরাইলের তমা সেন্টার গলির কাছে ৭৯/১ নম্বর বাড়ির ৫ তলার ফ্ল্যাট থেকে মা-ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন শামসুন্নাহারের ভাই আশরাফ আলী খোকন বাদী হয়ে রমনা থানায় মামলা করেন। আসামি করা হয় শামসুন্নাহারের স্বামী আব্দুল করিম, সতিন মুক্তা ও মুক্তার ভাই আল আমিন জনিকে।
কুমিল্লার মামলায় জামিন শুনানি ৭ জানুয়ারি : কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে পেট্রল বোমা হামলায় বাসের ৮ যাত্রী দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি ফের পিছিয়ে ৭ জানুয়ারি ধার্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক কেএম শামছুল আলম রোববার এ আদেশ দেন। এর আগে এ মামলায় ১১ নভেম্বর কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতের বিচারক আবদুর রহিম শুনানির দিন রোববার ধার্য করেছিলেন।
খালেদা জিয়ার পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়ার জামিনের শুনানি রাষ্ট্রপক্ষের বারবার সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত তিন দফা পেছানো হয়েছে। আদালত আগামী ৭ জানুয়ারি চতুর্থ দফায় শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছেন। এভাবে সময়ের আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ জামিন শুনানি বিলম্বিত করছে। এতে খালেদা জিয়া ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিএনপি-জামায়াত ২০ দলীয় জোটের হরতাল-অবরোধ চলাকালে ২০১৫ সালের ৩ ফেব্র“য়ারি ভোর রাতে কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আইকন পরিবহনের একটি নৈশকোচ চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুর নামক স্থানে পৌঁছলে দুর্বৃত্তরা বাসটি লক্ষ্য করে পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করে। এতে আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলে ৭ জন ও হাসপাতালে নেয়ার পর ১ জন মারা যান। ওই ঘটনায় চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই নুরুজ্জামান হাওলাদার বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন।
গত বছরের ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় কাকরাইলের তমা সেন্টার গলির কাছে ৭৯/১ নম্বর বাড়ির ৫ তলার ফ্ল্যাট থেকে মা-ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন শামসুন্নাহারের ভাই আশরাফ আলী খোকন বাদী হয়ে রমনা থানায় মামলা করেন। আসামি করা হয় শামসুন্নাহারের স্বামী আব্দুল করিম, সতিন মুক্তা ও মুক্তার ভাই আল আমিন জনিকে।
৩০ জুন করিম, মুক্তা এবং জনির নামে আদালতে চার্জিশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা রমনা থানার পরিদর্শক আলী হোসেন। ৫ নভেম্বর চার্জশিট গ্রহণ করেন আদালত। মুক্তা সবশেষ এ ঘটনার জন্য তার স্বামী করিম ও নিজের ভাই আল আমিন জনিকে দায়ী করলেও করিম দায়ী করেছে মুক্তা ও জনিকে। অবাক বিষয় হচ্ছে- শুরু থেকেই মামলার বাদী ও আসামিদের আইনজীবীর খরচ বহন করতে হচ্ছে অনিক এবং মুন্নাকেই।
পুলিশও তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে করিমসহ ওই তিনজনই জড়িত। তাদের যোগসাজশেই এ খুনের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগপত্রেও তাই বলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, এ নিয়ে ৫ নভেম্বর বিচারক তার খাস কামরায় ডেকে নেন মামলার বাদী আশরাফ আলী খোকন, খোকনের বড় ভাই আমানুল্লাহ এবং করিমের দুই ছেলে মুন্না ও অনিকসহ সংশ্লিষ্টদের। এ সময় মামলার বাদী বিচারককে জানান, তাদের দুই ভাগ্নে বিচার কাজে বিঘ্ন ঘটাতে চার্জশিটের ওপর নারাজি দিয়েছে। একই উদ্দেশে একটি সিআর মামলাও করেন। উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনার পর চার্জশিট গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন বিচারক।
এদিকে এই খুনের ঘটনা নিয়ে কারাবন্দি করিম ও মুক্তার অডিও রেকর্ড যুগান্তরের হাতে এসেছে। সেখানেও এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তারা একে অপরকে দায়ী করেছে।
অডিওতে মুক্তাকে বলতে শোনা যায়, হত্যাকাণ্ডের ৫ বছর আগে আমার সঙ্গে করিমের বিয়ে হয়। বিয়ের ৪ বছর পর করিম আমাকে গোপনে তালাক দেয়। এটি আমাকে না জানিয়ে আমার সঙ্গে মেলামেশা করতে থাকে। তালাকের ৫-৬ মাস পর করিমের বাড়ির কেয়ারটেকার মাজেদের মাধ্যমে আমি তালাকের বিষয়টি জানতে পারি। এরপর করিমের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দিলে করিম জানায়, সে শামসুন্নাহারের চাপে আমাকে তালাক দিয়েছে। পরে মাজেদের এক আত্মীয় ডিবি কর্মকর্তা আনিসুর রহমনাকে সাক্ষী করে মালিবাগ থেকে হুজুর এনে সে ফের আমাকে বিয়ে করে।
মুক্তা বলেছেন, জনিকে দিয়ে করিম তার স্ত্রী শামসুন্নাহার ও তার ছেলে শাওনকে হত্যা করেছে। একটি মোবাইল নম্বর থেকে আমাকে এবং করিমকে গালিগালাজ করা হতো। এ নিয়ে পল্টন থানায় একটি জিডিও করি। আমাকে নিয়ে করিম প্রায়ই তার স্ত্রী শামসুন্নাহারকে মারধর করত। শামসুন্নাহারও আমাদেরকে ফোনে নানাভাবে বকাঝকা করত। মুক্তা বলেন, এসব নিয়ে আমি দুই দফা আত্মহত্যার চেষ্টাও করি।
অডিও রেকর্ডে করিমের অভিযোগ, আমার ছেলেরা (অনিক এবং মুন্না) চেয়েছিল মামলাটির অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে পুরো সত্য বেরিয়ে আসুক। কিন্তু মামালার বাদী অধিকতর তদন্ত চাননি। এ কারণে অধিকতর তদন্ত হয়নি। পলাতক আসামিরা খুবই প্রভাবশালী। কাজের বুয়াকে আসামি করা হলেই তাদের নাম বেরিয়ে যেত। তিনি জানান, মুক্তা এবং মুক্তার ভাই জনির যোগসাজশে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
জানতে চাইলে মামলার বাদী আশরাফ আলী খোকন বলেন, এখন দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন এ ডাবল মার্ডারের বিচার কাজ শেষ হয় সেটাই একমাত্র কামনা। জানতে চাইলে মুন্না ও অনিক যুগান্তরকে বলেন, আমরা আমাদের মা এবং ভাইকে হারিয়েছি। যে বা যারা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের শাস্তির আওতায় আনা হোক।
অপরদিকে বাবা আব্দুল করিম জেলে থেকে নিজের দোষ অস্বীকার করে বলছেন, তোরা (অনিক ও মুন্না) ছাড়া আমার কেউ নেই। আমার জন্য যা কিছু করার তোরা তা কর। আমরা কোন দিকে যাব সেটির বুঝতে পারছি না।
No comments:
Post a Comment